আই লাভ কুরআন – বই রিভিউ

i love quran

বই : আই লাভ কুরআন
লেখক : মুহাম্মাদ আতিক উল্লাহ
প্রকাশক : মাকতাবাতুল আযহার
মুদ্রিত মূল্য : তিনশ চল্লিশ টাকা
পৃষ্ঠাসংখ্যা : চারশো

নাম থেকে শুরু করি। বইয়ের নাম আই লাভ কুরআন। নামটা যখন জেনেছিলাম তখন মনে হয়েছিল এটা আবার কেমন নাম! কুরআন আরবি, নামটা ইংরেজি, কেমন যেন! কিন্তু বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এই নামই একদম পারফেক্ট। এটা ম্যাটার নয় নামটি কোন ভাষায়, ব্যাপার হচ্ছে আমাদের প্রজন্মে ‘লাভ’ শব্দটা এত কমন যে আমরা অহরহ বলি— আই লাভ ইউ, আই লাভ হিম, আই লাভ হার, আই লাভ হার স্মাইল’ ইত্যাদি। লেখক কুরআনকেও একই পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। বইয়ের ‘আই লাভ ইউ’ অধ্যায়ে বিভিন্ন চিত্র তুলে বুঝিয়ে দিয়েছেন— না, কুরআন কোনো দূরের বস্তু নয়, বরং নিত্যদিন আই লাভ ইউ বলার বস্তু। অতিভক্তির কারণে ঘরের উঁচু তাকটাতে দিনের পর দিন ফেলে রাখার বস্তু নয়। বরং সন্তানকে প্রতিদিন জড়িয়ে ধরার মতো, প্রিয়জনের হাসির মতো প্রতিনিয়ত মোলাকাতের বস্তু। শিশুসন্তানকে জড়িয়ে যেমন আমরা গভীর আবেগে বলি— আই লাভ ইউ আম্মু অর আই লাভ ইউ আব্বু, কুরআন কারীমও ঠিক তাই। জগতের সকল ভালোবাসা ও আবেগ একত্রিত করে প্রতিনিয়ত বলে যাব— আই লাভ ইউ!

বইয়ের প্রথমে আছে চমৎকার একটি ভূমিকা। তাতে কুরআনের প্রতি ভালোবাসা, কুরআন পাঠের প্রতি উৎসাহ দেয়াসহ বেশ কিছুদিক আলোচনা করা হয়েছে। পড়তে পড়তে মনটা চঞ্চল হয়ে ওঠে তেলাওয়াত করার জন্য, তেলাওয়াত শোনার জন্য। কুরআনের কারীমের প্রতি এক আশ্চর্য মমতায় মন ভরে যায়।

এরপরে বইটিতে রয়েছে আটটি অধ্যায়।

প্রথম অধ্যায় : হিযবী মিনাল কুরআন
এই অধ্যায় পড়ার পর আমার মনে হয় না কারো হিযব আর ছুটতে পারে। যার হিযব নেই সেও নির্ধারণ করে নেবে। আমরা যারা দীনি খেদমতের নামে অনলাইনে প্রচুর সময় নষ্ট করি অথচ হিযব আদায় করা হয়ে ওঠে না তাদের জন্য এ অধ্যায় সবচেয়ে বেশি উপকারী। এখানেও বেশকিছু দিক তুলে ধরা হয়েছে। কোনটা রেখে কোনটা বলা যায়!

দ্বিতীয় অধ্যায় : আই লাভ ইউ সুইট হার্ট!
আবেগ ভালোবাসায় এতটা সৌন্দর্যমণ্ডিত এ অধ্যায় যে, ভাবতে বাধ্য হবেন, আমার কুরআনের সাথে আমার সম্পর্ক এমন তো? হ্যাঁ, মন খারাপ হলে কুরআনকেই জড়িয়ে ধরুন। মানুষ তো তাই করে, না? মৃত্যুর মতো কষ্টকর ব্যাপারেও আপনজনকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা নেয়। কুরআন হওয়া উচিত এতটাই আপন, এতটাই ভালোবাসার যে, মন খারাপের সময়ও যেন জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা পান! এ যেন আল্লাহর পক্ষ থেকেই সান্ত্বনা! কুরআন মিশে যাক প্রতিটি নিঃশ্বাসে।

তৃতীয় অধ্যায় : কুরআনি প্রজন্ম
এই অধ্যায়টা প্যারান্টিং নিয়ে। কীভাবে আপনার সন্তান হতে পারে কুরআনপ্রেমী তারজন্য নিয়ম-পরামর্শ। আমরা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্থির থাকি। চারদিকে সন্তানের অবাধ্য অস্থির আখলাক মা-বাবার বেঁচে থাকা হারাম করে দিয়েছে। মিথ্যাবাদী, জেদী, উচ্ছৃঙ্খল, ড্রাগ এডিক্টেড কিশোর-তরুণ। আমার সন্তানের জন্য তাই প্রচন্ড ভয় হয়। এ অধ্যায়টা যেন বলছে— ভয়ের কিছু নেই। একটা শিশু যদি বেড়ে ওঠে কুরআনের শিক্ষায় কুরআন প্রেমী হয়ে, সফল মানুষ হওয়ার জন্য তার আর কিছুই প্রয়োজন হয় না। আর কুরআনি প্রজন্ম মানে পৃথিবীর ভবিষ্যৎও উজ্জ্বল।

চতুর্থ অধ্যায় : জীবনের প্রয়োজনে কুরআন
এ অধ্যায়ে বিভিন্ন শিরোনামে বর্তমান সময়ে ধর্মীয় মানুষের মানসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বিভিন্ন মত ও অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। চরিত্রকে, জীবনকে কুরআনের আলোয় সমুজ্জ্বল করার পথ দেখানো হয়েছে।

পঞ্চম অধ্যায় : আয়াতমাখা গল্প
এ অধ্যায়ে আছে কুরআনের আয়াত সম্বলিত দারুণ সব গল্প ও আমলের জন্য জুররী কিছু শিক্ষা।

ষষ্ঠ অধ্যায় : মাদরাসাতুল আম্বিয়া
বড় একটি অধ্যায়। বিস্তারিত রিভিউ দিলে লেখা বড় হতেই থাকবে। মূলত এ অধ্যায়ে নবীদের কাহিনী সম্বলিত আয়াতের মিল-অমিল, আয়াতের সৌন্দর্য ও কুরআনের আলোকে নবীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, পরামর্শ, কুরআনি চিকিৎসাসহ বিভিন্নদিক তুলে ধরা হয়েছে।

সপ্তম অধ্যায় : কুরআনি ভাবনা
টুকরো টুকরো ভাবনা জড়ো করে এ অধ্যায়ে কুরআনের প্রতি ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।

অষ্টম অধ্যায় : মাদরাসাতুল কুরআন
এ অধ্যায়ে লেখক বিভিন্ন সুরা ও আয়াতের আলোকে জীবনের এত এত দিক তুলে এনেছেন যে আলাদা করে কিছু বলা সম্ভব নয়। মাদরাসাতুল আম্বিয়া ও মাদরাসাতুল কুরআন এ দুটো অধ্যায়কে ইলমের বাগান বলা যায়।

ছোট করে রিভিউ দিলে ভালো হয় কিন্তু বইটিতে যেহেতু কুরআনের আলোকে মানুষের জীবনের প্রায় সবগুলো দিকই তুলে ধরা হয়েছে তাই ছোট করে বইটি সম্পর্কে ভালো করে বলা সম্ভব নয়। বড় করে বললেও বইটির সৌন্দর্য পুরোপুরিভাবে তুলে ধরা সম্ভব নয়। সবগুলো অধ্যায় মিলিয়ে পুরো বইটিকে কীসের বলা যায়! মোটিভেশনাল? সাইকোথেরাপি? লাভ স্টোরি? নাকি ইলমের বাগান?

এ সময়ে যত বই বের হয়েছে এ বইটি সবচেয়ে সেরা হওয়ার দাবি রাখে। যারা লেখকের কাছে এই আশা ছিল, ওই আশা ছিল বলে হা-হুতাশ করেছেন আর লেখককে মুফিজুল ইসলামের সাথে তুলনা করছেন, তারা কি লেখকের এই বইটি পড়েছেন? কোনো লেখা আপনার ভালো না লাগলে লেখাটি নিয়ে আলোচনা করতেই পারেন কিন্তু একজন মানুষের কাজ শেষ পর্যন্ত না দেখে তাকে নিয়ে সমালোচনা কী ধরনের ইনসাফ? এত সুন্দর, এত চমৎকার একটা বই যে আশ্চর্য হতে হয়! এ বই পড়ার পর কারো কোনো অনুযোগ থাকতে পারে বলে মনে হয় না।

একটা জিনিস ভালো লাগেনি তা হলো— বইয়ে অসংখ্য সিম্বল। ‘হিযবী মিনাল কুরআন’ অথবা ‘কুরআনি ভাবনা’ অধ্যায়ের মতো বিষয় আলাদা করতে না হয় সিম্বলগুলো ঠিক আছে কিন্তু কোথাও কোথাও একই গল্পের ভেতরও সিম্বল দেয়া যা পাঠককে বিরক্ত করতে পারে। এত সুন্দর বইয়ের প্রচ্ছদও আরো সুন্দর হতে পারতো। কাগজ, ছাপার মান এসব সাধারণ। অসাধারণত বইটি সবদিক দিয়ে আরো অসাধারণ হলে ভালো লাগতো।

বইটি এতই সহজ সরল ভঙ্গিতে রচিত যে, যে কারো জন্য সহজবোধ্য। প্রতিটি ঘরে এক কপি রাখা যায়। বারবার পড়া যায়। ছাত্র-শিক্ষক, পিতা-পুত্র, প্রত্যেকেরই বইটি পড়া উচিত। যেহেতু আমি নারী, নারীর কথা বলি। ঘরের কাজের ব্যস্ততায় পরিবারে যিনি সবচেয়ে বেশি বই থেকে দূরে থাকেন তিনি আমাদের মা; ভাবতে ভালো লাগে আমাদের মায়ের হাতে বইটি তুলে দিব। তিনি পড়া শেষ করে হয়তো কুরআন হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন। তার যে জীবনের অধিকাংশ সময় রান্নাঘরে কেটেছে সেই জীবনটাই হঠাৎ মূল্যবান হয়ে উঠবে! নতুন জগত উন্মোচিত হবে তার সামনে। নতুন চিন্তায় আলোড়িত হবেন তিনি। আল্লাহ চাইলে এ বইয়ের কল্যাণে যে কুরআন তিনি সাধারণভাবে তেলাওয়াত করতেন সেই কুরআনই অজস্র রঙে রঙিন করে তুলবে বাঙালি বধূর সাধারণ জীবন।

 

রিভিউ লিখেছেন- মাজিদা রিফা আপু

(ইসলামি বই গ্রুপ থেকে সংগ্রহকৃত)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

19 + 5 =

বিষয় নির্বাচন করুন